শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

ইউরো ২০২০-এ ‘কালো ঘোড়া’ যারা (শেষ পর্ব)

যে কোন বড় ক্রীড়া প্রতিযোগীতার আসরে বড় দলগুলোর পাশাপাশি আসল আকর্ষণ থাকে ডার্ক-হর্সরা। মূলত এই কালো ঘোড়াদের জন্যই প্রতিযোগীতা হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর। বড় দলগুলোর থেকে তাদের লাইমলাইট কেড়ে নেয়ার ঘটনা ক্রীড়াপ্রেমীদের যোগায় বাড়তি তৃপ্তি। তাদের বদৌলতেই রচিত হয় অনুপ্রেরণার অনেক গল্প, প্রতিযোগীতা পায় তার আসল মাহাত্ম। তাই তো কালো ঘোড়াদের পক্ষে বাজি ধরার জন্য মুখিয়ে থাকেন সত্যিকারের ফুটবল ফ্যানাটিকরা!

আর ফুটবলযজ্ঞের নাম যখন ইউরো, তখন একটি বা দুটি দলকে ‘ডার্ক হর্স’ তকমা দেয়াটা একটু বিপদজ্জনকই বটে। অঘটন আর চমকের সঙ্গে যে একটু বেশিই বন্ধুত্ব তার! আগের পর্বে আলোচনা হয়েছিল সম্ভাবনা ও শক্তির বিচারে ইউরোর তিন কালো ঘোড়া নিয়ে। এবার তার শেষ পর্ব-

ইউরোর কালো ঘোড়াদের রেসে এবার সবচেয়ে তাগড়া ঘোড়া তুরষ্ক

ফিফা র্যাংকিং ২৯। বছর দুয়েক আগেও তারা পার করছিল নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। রোমানিয়ান কোচ মিরকা লুকেস্কুর আমলে জিততেই ভুলে গিয়েছিলো ২০০৮ এর ইউরো আসরে চমক জাগানিয়া দলটি। দলের চরম দুর্যোগপূর্ণ মূহুর্তে ২০১৯ এর সেপ্টেম্বরে ইউরো বাছাইপর্বের আগে আগে আত্মবিশ্বাসের তলানিতে থাকা তুরষ্ক জাতীয় দলের হাল ধরেন তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কোচ সেনল গুনেস। শুরু করেন নিজ দেশের হয়ে কোচিং ক্যারিয়ারের সেকন্ড হাফ। এর আগে ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ম্যানেজার হিসেবে তুরষ্কের ভার সামলেছিলেন তিনি। হাল ধরেই তুর্কিদের ইউরো বাছাইপর্বের বৈতরণী পার করান অভিজ্ঞ এই ফুটবল মাস্টারমাইন্ড।

গ্রুপ-এইচ এর বাছাইপর্বে গত বিশ্বকাপ ও ইউরোতে চমক দেখানো আইসল্যান্ডকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় হয় তার দল। সেই সাথে যোগ্য দল হিসেবেই জায়গা করে নেয় এবারের ইউরোর মূল পর্বে। বাছাইপর্বে তাদের গ্রুপসঙ্গী ছিল এবারের ইউরোর সবচেয়ে বড় দাবিদার ফ্রান্স, যাদের তারা ঘরের মাঠে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দেয়। এমনকি ফ্রান্সে গিয়েও ১-১ গোলের সমতা নিয়ে ফিরে আসে তারা। বাছাইপর্বে শুধু একটিমাত্র ম্যাচেই তারা হেরেছিল নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আইসল্যান্ডের কাছে।

কোচ সেনল গুনেসের একটাই কোচিং দর্শন। আর সেটা হচ্ছে কেবল আক্রমণ, আক্রমণ আর আক্রমণ। পরিসংখ্যানও বলে সেই কথা। তার বর্তমান মেয়াদে তুর্কিরা সর্বমোট ২৬ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে মোট ৪৮ বার। দলের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে আছেন বেশ কয়েকজন স্কোরার, নিজেদের দিনে যারা হয়ে উঠতে পারেন প্রতিপক্ষের ত্রাস।

তার উপর দলের প্রায় সবক’জন খেলোয়াড়ই আছেন ফর্মের তুঙ্গে। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এবারের ফ্রেঞ্চ লীগ ওয়ান মৌসুম। সদ্য শেষ হওয়া ফ্রেঞ্চ লীগে পিএসজি’র আধিপত্য হটিয়ে ১০ বছর পর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লিঁলে, যার প্রায় পুরো কৃতিত্ব বুরাক ইলমাজ, ইউসুফ ইয়াজিকির মতো তুর্কি সেনানীদের।

ফ্রেঞ্চ লীগে লিঁলের মতো ইউরোতে তুরষ্কেরও আক্রমণভাগের প্রধান সেনাপতি বুরাক ইলমাজ। বলা যায়, ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে এসে রীতিমত জ্বলে উঠেছেন ৩৫ বছর বয়স্ক এই বুড়ো ঘোড়া। ক্লাবের হয়ে শেষ দশ ম্যাচে ৯ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট সে কথাই জানান দেয়। মাঝমাঠে আছেন এসি মিলানের ২৭ বছর বয়স্ক তরুণ অথচ অভিজ্ঞ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হাকান কালহানগ্লু ও লিলের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইউসুফ ইয়াজিকি। দুজনেই নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম কাটিয়েছেন নিজ নিজ ক্লাবের হয়ে এবার। স্কোয়াডে আছেন তুর্কি মিডফিল্ডের তুরুপের তাস চেঙ্গিস উন্ডার। যদিও লেস্টারের হয়ে ক্লাব মৌসুমের বেশিরভাগটাই বেঞ্চ গরম করেছেন, কিন্তু মাঠে যতবারই নেমেছেন, দেখিয়েছেন তুর্কি ঘোড়ার তেজ। তরুণ হলেও অভিজ্ঞতার জোরে মাঝমাঠের আরেক ভরসার নাম ওজান তুফান। সর্বশেষ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আরবি লাইপজিগের বিপক্ষে এক হ্যাটট্রিক করেই ইরফান কান কাহভেচি প্রমাণ করেছেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে একটুও ফাঁক-ফোঁকর পেলে ডি-বক্সের বাইরে থেকেও তিনি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন।

অনেক হলো আক্রমণভাগ আর মাঝমাঠের কথা। তুর্কি রক্ষণও কিন্তু একেবারে হেলাফেলার নয়। তুর্কি রক্ষণ দুর্গের প্রধান পাহারাদারের দায়িত্বে থাকবেন জুভেন্টাসের মেরিহ ডেমিরাল। তার পাশেই দাঁরাবেন লেস্টার সিটির ক্যাগলার সেনচু, লিভারপুলের ওজান কাবাক। লেফটব্যাকে থাকতে পারেন নতুন টার্কিশ সেন্সেশন রিদওয়ান ইলমাজ। রাইটব্যাকে তাদের ভরসা লিঁলের হয়ে খেলা জেকি চেলিক ও সাসুলোর তরুণ রাইটব্যাক মার্ট মুলডার। গোলবারের নিচে সেনোল গুনেসের প্রথম পছন্দ এবার উগুরকান চেকির। ঘরোয়া লীগ ট্রাবজোন্সপোরের হয়ে ১৩ টি ক্লিন শীটের দারুণ মৌসুম কাটিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই অ্যাক্রোব্যাটিক গোলকিপার।

চাইলে লিস্টে রাখতে পারেন সুইজারল্যান্ডকেও

বিশ্ব ফুটবলে গড়পড়তা মধ্যমমানের দল বলে বিবেচিত হয়ে আসলেও রেড ক্রসদের সাম্প্রতিক উত্থান চোখে পড়ার মতো। ফিফা র্যাং কিংয়ে বর্তমানে তারা অবস্থান করছে ১৩ নম্বর অবস্থানে। আর পরিসংখ্যানের বিচারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য হচ্ছে, এবারের ইউরো বাছাইপর্বে গ্রুপ ডি থেকে চ্যম্পিয়ন হয়ে মূলপর্বে সুযোগ পেয়েছে তারা, যেখানে মাত্র একটি ম্যাচ হেরেছে তারা।

৭ বছর ধরে সুইস জাতীয় দলের মাস্টারমাইন্ডের আসনে আছেন ভ্লাদিমির পেতকোভিচ। তার অধীনে ৭৩ ম্যাচ খেলে কেবল ১৮টিতেই হেরেছে সুইসরা। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ একটি অবস্থা বিরাজ করছে সুইস স্কোয়াডে।

দলে আছেন ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের বড় বড় ক্লাবের বেশ কিছু পরিচিত মুখ। সুইসদের মাঝমাঠ পরিচালনায় আছেন জাদরান শাকিরি ও গ্রায়ান্ট জাকার মতো অভিজ্ঞ দুই কান্ডারি। মাঝমাঠে তাদের সঙ্গ দেবেন আটালান্টায় খেলা রেমো ফ্রিউলার, উলভসবার্গে খেলা আদমির মেহমেদি, ফ্রাঙ্কফুর্টের জিব্রিল শ ও স্টিভেন জুবেরের মতো মিডফিল্ডাররা। পেতকোভিচ তার দলের আক্রমণভাগ সাজিয়েছেন তরুণ ব্রিল এমবোলো এবং অভিজ্ঞ মারিও গাভ্রানোভিচ ও হারিস সেফারোভিচের সমন্বয়ে। বেনফিকায় কাটানো সর্বশেষ মৌসুমের ফর্ম ইউরোতেও টেনে নিতে পারলে সেফারোভিচই হয়ে উঠতে পারেন সুইসদের নায়ক। মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের মতো সুইসদের রক্ষণেও বিরাজ অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের ভারসাম্য। ফাবিয়ান স্খার, রিকার্ডো রদ্রিগেজের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি দলের রক্ষণ সামলাতে দেখা যাবে ম্যানুয়েল আকেনজি, কেভিন এমবাবু ও নিকো এলভেদির মতো প্রতিভাবান ডিফেন্ডারদের। গোলকিপারের দায়িত্ব বহন করতে দেখা যাবে বুরুশিয়া মনশেডগ্লাডবাখের গোলবার সামলানো ইয়ান সোমারকে।

উল্লেখ্য, ইউরোর অভিজ্ঞতা অবশ্য খুব সুখকর নয় রেডক্রস বাহিনীর। এর আগে মাত্র চারবার ইউরোর টিকেট পেতে সক্ষম হয়েছে তারা। প্রথম তিনবারে গ্রুপ রাউন্ড পেরোতে না পারলেও গত ইউরোতে রাউন্ড অব সিক্সটিনে পা দিতে সক্ষম হয়েছে তারা। কিন্তু মজার তথ্য হচ্ছে চারবারের অভিজ্ঞতায় সর্বমোট মাত্র দু’টি জয় আছে তাদের ঝুলিতে। তার উপর এবার তাদের গ্রুপসঙ্গী দুই বছর ধরে অপরাজিত ইতালি, দারুণ ছন্দে থাকা তুরস্ক এবং গ্যারেথ বেলের ওয়েলস।

ডার্ক-হর্স হিসেবে সুইজারল্যান্ড কতটা যোগ্য তা প্রমাণ হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আসল খেলা মাঠে গড়ানোর। ধারে-ভারে না হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও দলে বিরাজমান ভারসাম্যের ভিত্তিতে কাগজে-কলমে অন্তত ডার্ক হর্স ভাবতেই পারেন তাদের।

বাংলাদেশ প্রেস/মিশু

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ খবর

আরও খবর

ইউরো ফাইনালে ‘ইটস কামিং হোম’ গাইতে দিবে না উয়েফা!

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের পর বিগত ৫৫ বছরে আর কোন বড় আসরে শিরোপার মুখ দেখতে সক্ষম হয়নি ইংল্যান্ড। আর ইউরোর কথা তুললে অর্জনের ঝুলি সেখানে...

‘ইটস কামিং হোম’ নাকি ‘ইটস গোয়িং রোম’!

একপক্ষের জন্য যা কখনও ছুঁয়ে দেখতে না পারার আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ, অন্যপক্ষের জন্য তা অর্ধশত বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি টানার সুযোগ! ইউরোর শিরোপা নির্ধারণী শেষ...

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোতায়েন পুলিশের বিশেষ টিম

কোপা আমেরিকায় মেতে উঠেছে ফুটবল বিশ্ব। এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়ে গেছে ফাইনাল। আর সেই ফাইনালে খেলবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। দীর্ঘদিন পর এই দুই দেশ মুখোমুখি। তাই...

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডেনমার্ক হেরেছে বহুবার; হিউলম্যান্ড হারেননি একবারও!

বৃহস্পতিবার রাত ১টায় ইউরো ২০২০ এর শেষ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড ও ডেনমার্ক। লন্ডনের ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচটিতে সন্দেহাতীতভাবে আন্ডারডগ এবারের আসরে সবাইকে তাক...

স্পেনের সামনে পুরোনো শত্রু নতুন রূপেঃ ‘টিকিতালিয়া’ না অন্য কিছু?

বুধবার রাত ১টায় ইউরোর সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম পুরোনো দুই শত্রু ইতালি ও স্পেন। সময়ের হিসাবে শত্রুতা প্রায় ১০০ বছরের, যে...