ইউরো ২০২০-এ ‘কালো ঘোড়া’ যারা (পর্ব-১)

ইউরোতে কালো ঘোড়া যারা ছবি সংগৃহীত

যে কোন বড় টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই জল্পনা-কল্পনার বড় অংশ জুড়ে থাকে, ‘’শিরোপার দখল নিবে কারা’’। স্বাভাবিকভাবেই সে তালিকায় নাম থাকে হাই ভোল্টেজ দলগুলোর। চায়ের কাপে ঝড় ওঠায় ক্রীড়াপ্রেমীরা, চলে তুমুল তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু বাঘা বাঘা দলগুলোর আড়ালেও কিছু দল থাকে যারা পালটে দিতে পারে টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ হিসাব-নিকাশ। সুঁই ফিটিয়ে চুপসে দিতে পারে যে কোন মহীরুহের প্রত্যাশার বিশাল বেলুন। এমনকি সব পরিসংখ্যান ও ইতিহাস ভেঙেচুড়ে নিজেরাই গড়ে নেয় নতুন ইতিহাস। মূলত এই কালো ঘোড়াদের জন্যই প্রতিযোগীতা হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর, দর্শকদের ক্ষরণ হয় এড্রিনালিন।

প্রতিযোগীতার নাম যখন ইউরো, তখন একটি বা দুটি দলকে ‘ডার্ক হর্স’ তকমা দেয়াটা একটু বিপদজ্জনকই। শক্তিমত্তার বিচারে সমানে সমান লড়াই চলে সেখানে। তার উপর এবারের ইউরোর ফল নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে ভিএআর, হোম ভেন্যুসহ কিছু ব্যতিক্রমী ফ্যাক্টর। ছয় গ্রুপ বিশ্লেষণ করে দেখা যাক এবারের আসরের ‘ডার্ক হর্স’ কারা!

নেদারল্যান্ডস; গ্রুপ-সি

ইউরোতে মোট নয়বার অংশগ্রহণ করে একবার শিরোপা জিতেছে ডাচরা। এই এক লাইনের তথ্যের ভিত্তিতে তারা ইউরোর সফল দলগুলোর মধ্যেই বিবেচিত হবার কথা। কিন্তু তাদের শিরোপার শক্ত দাবিদার বলা যাচ্ছে না; কারণ, ডাচ ফুটবলের সুসময় এখন সোনালী অতীত, তাদের নতুন প্রজন্মের উত্থান হয়েছে মাত্র। দলে অভিজ্ঞতার যথেষ্ট অভাব আছে। তাছাড়া গত ইউরো এবং বিশ্বকাপ, দুই আসরেই কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়েছে রোবেন, স্নেইডারবিহীন নেদারল্যান্ডস। কিন্তু দেশটির ফুটবলে নবজাগরণের সূচনা হয়েছে ইতিমধ্যে। দলে রয়েছে বেশ কিছু তরুণ প্রতিভা, খেলছে ইউরোপের বড় বড় সব ক্লাবে। শুধু তাই নয়, দলটি এবারের ইউরো বাছাইয়ে গ্রুপ-সি থেকে দ্বিতীয় হয়ে সরাসরি জায়গা করে নিয়েছে মূলপর্বে। বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষের মাঠে শক্তিশালী জার্মানিকে ৪-২ গোলে পরাজিতও করেছে তারা। কিন্তু নতুন কোচ ফ্রাঙ্ক ডি বোরের অধীনে ভালো ছন্দে নেই ডাচরা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ১১ ম্যাচে কেবল ৫ টিতেই জয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে ফ্রাঙ্কের দল।

ইউরোর স্কোয়াডঃ

গোলকিপারঃ টিম ক্রুল (নরউইচ সিটি), মার্টেন স্টেকেলেবার্গ(আয়াক্স), মার্কো বাইজোত( এজেড আকমার)

ডিফেন্ডারঃ প্যাট্রিক ভ্যান আনহল্ট(ক্রিস্টাল প্যালেস), নাথান আকে( ম্যানসিটি), ডেলে ব্লাইন্ড(আয়াক্স), ডেনজেল ডামফ্রাইস(পিএসভি), ম্যাথিয়াস ডি লিট( জুভেন্টাস), ভেল্টম্যান(ব্রাইটন), স্টেফান ডি ভ্রিজ(ইন্টার মিলান), জুরিন টিম্বার(আয়াক্স),ওয়েন ভেনডাল(এজেড)

মিডফিল্ডারঃ রায়ান গ্রাভেনবার্চ(আয়াক্স), ফ্রাঙ্কি ডি ইয়াং(বার্সেলোনা), ডেভি ক্লাসেন(আয়াক্স), মার্টেন ডি রুন(আটালান্টা), জর্জিনিয়ো ভেনালডাম(পিএসজি), কুপমেইনারস(এজেড)

ফরোয়ার্ডঃ লুক ডি ইয়ং(সেভিয়া), মেম্ফিস ডিপে(লিঁও), উট ওয়েগহর্স্ট(উলভসবার্গ), কুইন্সি প্রমিস(স্পার্টাক মস্কো), কোডি গাকপো(পিএসভি), ডনিয়েল মালেন(পিএসভি), স্টিভেন মার্গুইস(ফেইনুর্দ)

যাদের পারফর্মেন্সের উপর নির্ভর করছে ডাচদের সাফল্যঃ ম্যাথিয়াস ডি লিট( জুভেন্টাস), ফ্রাঙ্কি ডি ইয়াং(বার্সেলোনা), ), জর্জিনিয়ো ভেনালডাম(পিএসজি), মেম্ফিস ডিপে(লিঁও), উট ওয়েগহর্স্ট(উলভসবার্গ)।

শক্তিমত্তা ও র‍্যাংকিং এর বিচারে গ্রুপপর্বে তুলনামূলক সহজ তিন বাধাই পেরোতে হবে ডাচদের। গ্রুপ-সি তে তাদের সাথে লড়াই করবে ইউক্রেন, অস্ট্রিয়া ও নবাগত নর্থ মেসিডোনিয়া। উপরন্তু তিনটি ম্যাচেই নেদারল্যান্ডস পাচ্ছে হোম ভেন্যুর সুবিধা।

ডেনমার্ক; গ্রুপ বি

ইউরোতে মোট অংশ নিয়েছেঃ ৮ বার।

সেরা সাফল্যঃ চ্যাম্পিয়ন (১৯৯২)

গতবারের ইউরোতে মূলপর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হলেও এবারের বাছাইপর্বে গ্রুপ ডি থেকে দ্বিতীয় হয়ে সরসরি মূলপর্বে খেলছে তারা। তাছাড়া নতুন কোচ কেসপার হুলমান্ডসের অধীনে বেশ ছন্দেই আছে ডেনিসরা। গত বছরের জুলাইতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ৯ ম্যাচে ৭ জয় পেয়েছেন ডেনিস এই ম্যানেজার। এছাড়া দলের গোলবার সামলাচ্ছেন কেসপার স্মাইকেলের মতো অভিজ্ঞ গোলকিপার। মাঝমাঠে আছে ক্রিস্টেন এরিকসনের মতো অভিজ্ঞ মাস্টারমাইন্ড। মাঝমাঠে তাকে সঙ্গ দিবে তরুণ এমিল হজবার্গ এবং থমাস ডিলেনি ও ডেনিয়েল ওয়াসের মতো অভিজ্ঞরা। আক্রমণভাগের ভরসা বার্সেলোনায় খেলা মার্টিন ব্রেথওয়েট ও আরবি লেইপজিগের ইউসুফ পলসেন। রক্ষণভাগের দায়িত্ব ন্যস্ত আছে সিমোন কাহের, আন্দ্রে ক্রিসেটেনসেন, জেনিক ভেস্টেগার্ড, জোয়াকিম মেলে ও জেনস লারসেনের এর মতো পরীক্ষিতদের হাতে। বলা যায়, তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে বেশ ব্যলেন্সড একটি দলই হয়ে উঠেছে ডেনমার্ক।

ইউরোর মূলপর্বে গ্রুপ বি তে ডেনমার্কের গ্রুপসঙ্গী গত বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান অধিকারী ও এবারের ইউরোতে শিরোপার অন্যতম দাবিদার বেলজিয়াম। আরও লড়াই করবে গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট রাশিয়া এবং নবাগত ফিনল্যান্ড। কিন্তু তিনটি ম্যাচেই ডেনিশরা পাচ্ছে হোম ভেন্যুর সুবিধা, যা তাদের বাড়তি সাহস যোগাচ্ছে।

রাশিয়া; গ্রুপ বি

বর্তমান র‍্যাংকিং ও অন্যান্য পরিসংখ্যান যা-ই বলুক না কেন, ইউরোতে রাশিয়ার রেকর্ড অনেক বড় দলের চেয়েও ভালো। এবারের আসরসহ মোট ১১ বার (২য় সর্বোচ্চ) তারা ইউরো খেলেছে। একবার শিরোপাও জিতেছে। কিন্তু এই সব রেকর্ডই সুদূর অতীত। ১৯৬০-১৯৮৮ পর্যন্ত তারা সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে ইউরোতে অংশগ্রহণ করেছে এবং ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ইউরোর প্রথম আসরের বিজয়ী তারা। উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের আগ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিই ছিল।

১৯৯৩ থেকে রাশিয়া হিসেবে খেলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ বার তারা ইউরোতে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। রাশিয়া হিসেবে তাদের সেরা সাফল্য আসে ২০০৮ এ অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডে আয়োজিত ইউরোতে। সেবার তারা টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল এবং চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছিল।

দলটির ফিফা র‍্যাংকিং বর্তমানে ৩৯ হলেও এবারের ইউরো আসরে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক ফ্যাক্টর তাদের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। প্রথমত, নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত গত বিশ্বকাপ আসরে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে দল নিয়েও সবাইকে চমকে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল রাশিয়া। টাইব্রেকারে কপাল না পুড়লে বিশ্বকাপ যাত্রাটা আরেকটু বড়ই হতো তাদের। এবারের ইউরোতেও বেলজিয়াম ও ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সুবিধা পেতে যাচ্ছে তারা। দলের অধিনায়ক আর্তেম জুবা নিজেদের লক্ষ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে জানিয়েছেন, তার দল এবার ইউরোতে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে চায়। আর এই লক্ষ্য অর্জনের পথে এবারের ইউরোতেও গত বিশ্বকাপের স্কোয়াডটি অপরিবর্তিতই রেখেছে রাশিয়া।

রাশিয়ার হয়ে এবার বিশেষভাবে নজর কাড়তে পারে যারাঃ

আলেক্সান্ডার গলোভিন- ফেঞ্চ লিগে এফসি মোনাকোর হয়ে খেলা ২৫ বছর বয়সী তরুণ এই মিডফিল্ডারের আছে দারুণ ফ্রি-কিক নেবার ক্ষমতা। খেলতে পারেন মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের যে কোন জায়গায়। গোলবারে নিতে পারেন নিখুঁত দূরপাল্লার শট। সেই সাথে আছে দারুণ ড্রিনলিং। এবারের ইউরোতে লম্বা পথ পাড়ি দিতে রাশিয়া তাকিয়ে থাকবে তার পায়ের দিকে।

আলেক্সেই মিরানচুক- রাশিয়ার আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা। মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও দলের প্রয়োজনে স্ট্রাইকারের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হতে পারেন ইতালিয়ান সিরি আ তে আটালান্টায় খেলা  ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ প্রতিভা। নিখুঁত ফিনিসিং আর দুর্দান্ত ফ্রি-কিক মিরানচুকের প্রধান শক্তি। কঠিন লক্ষ্য পূরণে তার শক্তিমত্তার উপরও ভরসা থাকবে অধিনায়কের।

বাংলাদেশ প্রেস/মিশু