৫৩ বছরের অপেক্ষা ফুরাবে কি ইতালির?

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল তারা। নামের পাশে আছে চার চারটি বিশ্বকাপ শিরোপা। ফুটবলের বড় সব আয়োজনে তাদের নিয়ে প্রত্যাশার পারদ থাকে তুঙ্গে। সেই দলটিরই কি না মহাদেশীয় মঞ্চে সবেধন একটিমাত্র শিরোপা! তাও তো গত শতাব্দীর কথা। এরপর অনেক রথী-মহারথীরা এসেছে দলে, বেশ কয়েকবার বিশ্বমঞ্চে উঁচিয়ে ধরেছে শিরোপা, কিন্তু মহাদেশীয় মঞ্চে শিরোপা ছোঁয়া আর হয় নি। এই শতাব্দীতেই দু’বার শিরোপার একদম কাছে গিয়েও তাদের লিখতে হয়েছে ‘তুমি কত কাছে, তবু কত দূরে’র মতো গল্প।

বলছিলাম ইতালির কথা, নিজেদের প্রথম ইউরো আসরে পা দিয়েই যারা জিতে নিয়েছিলো শিরোপা। সেই যে জিতেছিল, এরপর এক এক করে কেটে গেছে ৫৩টা বছর। চলে গেছে আরও ১২ টি আসর। এর মধ্যে গত শতাব্দীর ‘৮২তে আর এ শতাব্দীর ’০৬-এ দুবার বিশ্বকাপও জিতে ফেলেছে তারা। তাদের বিশ্বকাপজয়ী দুটি জেনারেশনও সক্ষম হয়নি ইউরো মিশন সাক্সেসে!

এসব গল্প করতে করতেই তাদের অপেক্ষার প্রহর ফুরানোর এসে হাজির দুয়ারে। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা। তাদের ম্যাচ দিয়েই মাঠে গড়াতে যাচ্ছে ইউরোর ১৬ তম আসরের বল। উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের মুখোমুখি এবারের আসরের ডার্ক হর্স তুরষ্ক। এবার তাদের অপেক্ষার পালা ফুরাবে নাকি অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ করে দিয়ে আরেকটা আক্ষেপের গল্প রচিত হবে তার উত্তর আপাতত তোলা থাক সময়ের হাতে। বরং দেখে নেয়া যাক, ইউরোর শিরোপার তারা আসলে কতটুকু!

গত বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হওয়ার সাথে সাথেই ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন বুঝে যায় দেশের ফুটবল পৌঁছে গেছে অধপতনের তলানিতে। উঠে আসতে হলে দরকার এমন কারও হাত যার শূণ্য থেকে সাফল্য ছোঁয়ার অভ্যাস আছে। দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো পোড় খাওয়া কোচ রবার্তো মানচিনির হাতে। মানচিনির স্পর্শ পেতে না পেতেই যেন জাদুর মতো রাতারাতি বদলে গেলো দলের অবস্থা!

এখন পর্যন্ত তার অধীনে সর্বমোট ৩২ ম্যাচে মাত্র দুই ম্যাচে হেরেছে আজ্জুরিরা। গত দুই বছর ধরে  আছে অপরাজিত। তার চেয়ে অবাক করা ফ্যাক্ট- রক্ষণাত্মক ফুটবলের প্রতীক যে দল তারাই কিনা এই ৩২ ম্যাচে গোল করেছে ৭৯টি। প্রতি ম্যাচে গড়ে ২.৪৭ গোল! আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য বিখ্যাত দলগুলোরও তো এমন পরিসংখ্যান নেই! খেলার ধরন পাল্টেছে বলে ভাববেন না, আজ্জুরিরা রক্ষণে অমনযোগী হয়ে গেছে। বরং ঐতিহ্য ধরে রেখে আজ্জুরিদের ডিফেন্স এখনও যথেষ্ট নিঁখুত। ৩২ ম্যাচে মাত্র ১৪ বার তাদের ডিফেন্স ভাঙতে সক্ষম হয়েছে প্রতিপক্ষরা। আজ্জুরিদের রক্ষণদ্বারে সদা তটস্থ পাহারায় থাকেন বিশ্বস্ত দুই গার্ড- জর্জিও কিয়েলিনি ও লিওনার্দো বনুচ্চি। ডানপ্রান্তে ভরসার দেয়াল হয়ে আছেন অভিজ্ঞ আলেসান্দ্রো ফ্লোরেঞ্জি, বামপ্রান্তে লিওনার্দো স্পিনাজ্জোলা কিংবা রাফায়েল তলোই। রক্ষণভাগের বিকল্প হিসেবে আছেন সদ্য ইন্টার মিলানের হয়ে দারুণ মৌসুম শেষ করা আলেসান্দ্রো বস্তানি। আছেন এমারসন পালমেরি ও ফ্রান্সেস্কো আকের্বি। রক্ষণের ক্ষেত্রে আজ্জুরিরা যে অভিজ্ঞতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয় তা আর না বললেও চলে।

ইউরো বাছাইপর্বে মানচিনির বদলে দেয়া ইতালির রেকর্ড আরও ভয়ঙ্কর। এবারের ইউরো বাছাইপর্বে গ্রিপ জে তে খেলেছিলো তার দল। সেখানে দশ ম্যাচে ৩৭ গোল দেয়ার বিপরীতে হজম করেছে মাত্র চার গোল। বোঝাই যাচ্ছে, বুফনের যোগ্য উত্তরসূরী পেয়ে গেছে আজ্জুরিরা। মাত্র ১৯ বছর বয়সী ডুন্নারোমা ১০ ম্যাচে ক্লিন শীট রেখেছেন ৬ ম্যাচে।

রক্ষণভাগ বুড়োদের হাতে দিয়ে রাখলেও মানচিনি তার মাঝমাঠ সাজিয়েছেন টগবগে তরুণদের দিয়েই। ইতালির মাঝমাঠও তাই আগের তুলনায় অনেক বেশি এ্যাকটিভ, প্রচুর গোল উৎপাদন করে। ইতালির মাঝমাঠের মেজ্জালা বর্তমানে জর্জিনহো। সদ্যই চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতে দারুণ উজ্জীবিত মুডে আছে ২৬ বছর বয়সী এই সেন্টার মিডফিল্ডার। আছেন আজ্জুরিদের নতুন সেন্সেশান নিকোলা বেরেল্লা ও ফ্রেডেরিকো কিয়েসা। আরো আছেন নতুন পিরলো বলে এরই মধ্যে খ্যতি পাওয়া ম্যানুয়েল লোকাতেল্লি। আছেন অভিজ্ঞ মার্কো ভেরেত্তিও।

রবার্তো মানচিনির ছোঁয়ায় আজ্জুরিদের আক্রমণভাগও বেশ ধারালো এবং পরিণত। আক্রমণবাগে তাদের মূল ভরসার নাম সিরো ইমোবিলে। গত দুই মোউসুম ধরে আছেন নিজের সেরা ফর্মে। তার সাথে আছেন আরেক অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড ইনসিগনে। আছেন নতুন সেন্সেশন ডমিনিকো বেরার্দি। ইতালির আক্রমণের তিন ফলাই যে বেশ ধারালো তা তাদের পরিসংখ্যান ঘাটলেই বোঝা যায়।  আছেন পরিশ্রমী স্ট্রাইকার আন্দ্রে বেলত্তিও, যিনি সাবস্টিটিউট স্ট্রাইকার হিসেবেও দারুণ কার্যকরী।

স্কোয়াড, পরিসংখ্যান, খেলোয়ারদের ফর্ম বিবেচনায় নিলে ইতালিকে এবারের ইউরোর দাবিদার না বলে উপায় নেই। তাছাড়া জয়টাকে যেভাবে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে তারা ৫৩ বছরের অপেক্ষা ফুরানোর আশা করতেই পারে তারা।

বাংলাদেশ প্রেস/মিশু